চট্টগ্রাম জেলার দ্বীপ উপজেলা সন্দ্বীপ। ১৮৮০ সালের পূর্বে সন্দ্বীপ চট্টগ্রাম জেলার অন্তর্ভূক্ত থাকলেও পরবর্তিতে নোয়াখালী জেলার অন্তর্ভূক্ত করা হয়। ১৯৫৪ সালে পুনরায় চট্টগ্রাম জেলার আওতায় আসে। ১৯৮৪ সালে সন্দ্বীপ থানাকে উপজেলায় রূপান্তর করা হয়। ১৯৯৯ সালে সন্দ্বীপ পৌরসভা প্রতিষ্ঠিত হয়। তবে সন্দ্বীপ থানা কখন প্রতিষ্ঠিত হয় এই ব্যাপারে অনলাইন অফলাইন অজ্ঞ। কমল চৌধুরী সম্পাদিত চট্টগ্রামের ইতিহাস বই থেকে জানা যায় ১১ নভেম্বর ১৬৬৫ খ্রিঃ সোনদ্বীপ অধিকার ও তথায় মোঘল থানা স্থাপন করা হইলো!
অর্থাৎ মোঘলরা ১৬৬৬ খ্রিস্টাব্দে চট্টগ্রাম দখল করার আগে প্রথমে সন্দ্বীপ দখলে নেয়। নদীপথে নিকট দূরত্বের কারণে চট্টগ্রাম দখলে নেয়ার জন্য সন্দ্বীপ সবচেয়ে ভালো জায়গা।
নদী ভাঙ্গনের কবলে পড়ে সন্দ্বীপ এখন আয়তনে অনেক ছোট।পঞ্চদশ শতাব্দীতে সন্দ্বীপের আয়তন প্রায় ৬৩০ বর্গমাইলের হলেও ক্রমাগত নদী ভাঙনের কারণে বর্তমানে এটি মাত্র ৮০ বর্গমাইলের একটি ক্ষুদ্র দ্বীপে পরিণত হয়েছে। সেই সূত্রধরে প্রতিনিয়ত কেউ না কেউ সন্দ্বীপে নিজেদের বসতভিটা ছেড়ে আশ্রয় নিচ্ছে মূল ভূখণ্ডে। অর্থাৎ চট্টগ্রামের হালিশহর, হাটহাজারি, পার্বত্য চট্টগ্রাম, এমনকি সারা বাংলাদেশে। সামর্থ্যের উপর নির্ভর করে কেউ কেউ পাড়ি জমাচ্ছে দেশের বাহিরে। অবশ্যই সবাই সন্দ্বীপের বাহিরে গিয়ে নিজস্ব বাড়ি করতে পারছেনা। বেশিরভাগ মানুষ ভাড়া দিয়েই বসবাস করছে। কারণ হিসেবে উঠে আসছে :
১। যাতায়াত ব্যবস্থা
২। উন্নত জীবনযাত্রা
৩। নিরবিচ্ছিন্ন বিদ্যুৎ (যদিও বর্তমানে সাবমেরিন ক্যাবলের মাধ্যমে সন্দ্বীপ জাতীয় গ্রিডের সাথে সম্পৃক্ত)
৪। উন্নত শিক্ষা ব্যবস্থা
৫। চিকিৎসা
৬। নদী ভাঙ্গন
সকল দিক বিবেচনা করেই দীর্ঘদিন ধরে মানুষ দ্বীপ ছাড়ছে। প্রায় প্রতি বাড়িতেই কেউ কেউ লাখ লাখ টাকা খরচ করে ঘরে তুলে আবার দ্বীপ ছেড়েছে। সন্দ্বীপ ন্যশনাল গ্রিডের বিদ্যুতে সংযুক্ত হবার পরে কেউ কেউ সন্দ্বীপ ফিরে আসছে। সেটা সংখ্যায় খুব কম।

সন্দ্বীপবাসীর দাবী সন্দ্বীপ আস্তে আস্তে উন্নত হচ্ছে। উন্নয়নের কিছু অংশ খালি চোখেই দেখা যায়। বিদ্যুৎ আসার পরে এখন ঘরে ঘরে টিভি, ফ্রিজ, এসিও মাঝেমধ্যে দেখা যায়। ব্যবসা প্রতিষ্ঠানে ত আছেই। ব্লেন্ডার, মাইক্রো ওয়েব ওভেনের মতো মর্ডান হোম এক্সেসোরিজের ব্যবহারও বেড়েছে। গ্যাস সিলিন্ডারের ব্যবহারও অনেক পুরনো। সামর্থ্যবানরা ২০০০ সালের আগে পরে গ্যাস সিলিন্ডার ব্যবহার শুরু করেছে। দ্বীপের মানুষের সাথে কথা বলে অনুমান পাওয়া যায় দ্রব্যমূল্যের উর্ধগতির এই যুগে লাকড়ি আর গ্যাসের সিলিন্ডারের খরচ অনেটা কাছাকাছি। একটা সময় জ্বালানীর অন্যতম সোর্স বাগিছার পাতা, গাছের শুকনো ডাল থাকলেও এখন আর কাউকে তেমন কুড়াতে দেখা যায়না।

জাতীয় গ্রিডের বিদ্যুৎ না থাকলেও সন্দ্বীপ ২০০০ সাল থেকে আলোকিত। সৌরবিদ্যুত ছিল সন্দ্বীপের অন্যতম আলোর উৎস। সৌর বিদ্যুৎ নেই এমন ঘর খুঁজে পাওয়া মুশকিল। এছাড়াও হারিকেন, তেলের কুপি, বিয়েশাদি ও বিভিন্ন অনুষ্ঠানে হ্যাজাক লাইট ব্যবহার হলেও পরে সেই স্থান দখল করেছে জেনারেটর। রাতে চলাচলের জন্য হারিকেন, ব্যাটারি চলিত টর্চ লাইট আর এখন রিচার্জেবল টর্চ লাইটের ব্যবহার রয়েছে।
ব্যক্তিগত চলাচলের জন্য সাইকেলের জায়গা দখল করেছে মোটরসাইকেল। প্রতি ঘরে একের অধিক মোটরসাইকেল রয়েছে। এছাড়াও সন্দ্বীপে পাওয়া যায় ভাড়ায় চলিত মোটর সাইকেল। ড্রাইভারসহ অথবা ড্রাইভার ছাড়া। ঘণ্টা, দিন, অথবা ট্রিপ হিসেবে নির্ধারিত হয় ভাড়া। তবে কোন পেট্রোল পাম্প নেই। প্রায় সব বাজারে পাওয়া যায় খোলা তেল। সরকার নির্ধারিত দামের চাইতে একটু বেশি দামে। তবে খুব গুরুত্বপূর্ণ একটি সেফটি এলিমেন্ট ‘হেলমেট’ এখানে খুঁজে পাওয়া দুষ্কর।
এছাড়াও রয়েছে সিএনজি, টমটম, বিদ্যুৎ চলিত রিকশা। ইদানীং প্রাইভেট কার, মাইক্রো বাসও চোখে পড়ে। মাইক্রোবাস মূলত ব্যবহার হয় বিয়েশাদী বা বড় কোন প্রোগ্রামে। ৮০ বর্গমাইলের এই দ্বীপ ঘুরে বেড়ানোর জন্য মোটরসাইকেল যথেষ্ট।
মালামাল পরিবহণে বিভিন্ন সাইজের ট্রাক পাওয়া যায়। যা শুধুমাত্র দ্বীপের জন্যই ডিজাইন করা। মূল ভূখণ্ড থেকে আলাদা হবার কারণে ট্রাফিক আইনের তোয়াক্কা কাউকে তেমন করতে দেখা যায়না। বেপরোয়া গতির জন্য এখানকার প্রায় সকল ট্রাক চালকের বদনাম রয়েছে।

একটা সময় সন্দ্বীপ লবণ, জাহাজ শিল্পের জন্য জনপ্রিয় থাকলেও এখনকার প্রজন্ম সেই ইতিহাসও ঠিকঠাক জানেনা। তথাকথিত উন্নয়ন শুরুর আগে সন্দ্বীপের বাজারে শীতের মৌসুমে শীতকালীন সবজি পাওয়া গেলেও এখন আর পাওয়া যায়না। বাজারে সব আমদানিকৃত সবজীর মেলা। খালি পড়ে আছে মৌসুমী ফসলের জমিজমা। ভৌগলিক কারণে হোক আর অলসতার কারণে চাষাবাদে আগ্রহী মানুষের সংখ্যা কমে গেছে অনেক। উত্তরবঙ্গের তুলনায় দেরিতে এইদিকে দেরীতে শীত শুরু হয় বলে কৃষকের ফসলের ন্যায্য মূল্য পায়না বলেও দাবি করেছেন কেউ কেউ। প্রবাস নির্ভর অর্থনীতিও চাষাবাদে অনীহার কারণ। বাবা চাষাবাদ করলে সন্তানের ইজ্জতহানী হয়, সেইজন্য পারিবারিক চাপও অনেককে কৃষি বিমুখ করেছে।
দেড় যুগ আগেও শীতের মৌসুমে সন্দ্বীপে চীনাবাদাম, মিষ্টি আলু, পেয়াজ, রসুন, খেসারি ডাল, সরিষা, ফেলন ডালসহ নানান জাতের সবজী উৎপন্ন হতো। এখন সেসব অতীত।
পুকুর, খালের পাশাপাশি বিল থেকেও পাওয়া যেতো নানান রকমের মাছ। এখন বর্ষায় খাল আর শীতে পুকুর থেকে কিছু মাছ পাওয়া যায়। বাকি সব মাছের যোগান আসে স্থানীয় মাছের প্রজেক্ট থেকে। দেশী মুরগী হাঁস আগে ঘরে ঘরে পালিত হতো, এখন ঘরোয়া হাঁস মুরগী পালনের প্রবণতাও কমেছে। তবে বয়লার মুরগীর প্রজেক্ট চোখে পড়ছে অনেক। প্রায় এলাকায় চোখে পড়ছে প্রচুর বয়লার খামারের।
সেই তুলনায় হাঁস, কবুতরসহ অন্যান্য পালনজাত পাখির খামার নেই বললেই চলে।
সন্দ্বীপের বাহিরের মানুষ সন্দ্বীপকে মহিষের জন্য জনপ্রিয় ভেবে থাকলেও সেটা পুরোটা অবাস্তব। অথচ সন্দ্বীপের চারপাশের বিশাল চারণভূমি গরু, ছাগল, মহিষ, ভেড়া পালনের জন্য উপযুক্ত। তবে অবশ্যই প্রাকৃতিক দুর্যোগ মাথায় রেখে কাজ করতে হবে। একইসাথে খামারে গরু ছাগল চাষের সম্ভাবনাও রয়েছে। এক্ষেত্রে কিছু বাঁধাপ্রাপ্ত হয়েছে অতীতের কিছু খামারি।
১। খামার কেন্দ্রিক প্রয়োজনীয় কাঁচামালের উচ্চমূল্য
২। পর্যাপ্ত ভেটের অভাব
৩। গ্রাহক সাইটে করোনা ভাইরাসের পাদূর্ভাবে সাময়িক অর্থ সংকট
স্থানীয় চাহিদা মেটাতে প্রয়োজনীয় দুধ, ডিম, মাংসের চাহিদা পূরণ করার মতো পর্যাপ্ত খালি জায়গা রয়েছে। বর্তমানে সন্দ্বীপের দক্ষিণ প্রান্তের চাইতে উত্তর পশ্চিম প্রান্ত চাষাবাদে বেশ সক্রিয়। উত্তরে এখনো চাষাবাদ হচ্ছে। ভেড়া, মহিষ পালনের জন্যও উত্তর দিকটা ভালো। সন্দ্বীপের অন্যতম ঐতিহ্যবাহী মহিষের দুধের দই এর জন্য প্রচুর মহিষের দুধের চাহিদা রয়েছে। মহিষের দুধের লিটার ১৭০ টাকা! সকল ঋতুতে দইয়ের চাহিদা থাকে।
ভেড়ার মাংসের চাহিদা বিভিন্ন প্রোগ্রামকে কেন্দ্র করে তৈরি হয়। এক কেজি ভেড়ার মাংস এখন ৮০০ টাকা। এত চড়ামূল্যে নিয়মিত বাজারে বিক্রি কম হয়। ভেড়া পালনে কিছু চ্যালেঞ্জ।
১। বিশ্বস্ত দক্ষ কর্মী পাওয়া দুষ্কর
২। খামারীকে নিয়মিত তত্বাবধানে থাকতে হবে
৩। পর্যাপ্ত নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে হবে (চোর ও কুকুরের খপ্পর থেকে বাঁচানোর জন্য)
৪। পশুর স্বাস্থ্য পরিচর্যায় পশু ডাক্তার নিশ্চিত করতে হবে
সব ধরনের পশু খাদ্য আমদানি করতে হয়। শুধু পশু খাদ্য নয়, মানুষের খাদ্যও আমদানি করতে হচ্ছে। এক কথায় সন্দ্বীপ এখন পুরোপুরি আমদানি নির্ভর। এই আমদানি নির্ভর পরিবেশ বদলাতে না পারলে ঢাকা আর সন্দ্বীপের খরচ একই হবে। বরঞ্চ যাতায়াত সমস্যার কারণে এখানে আরও বাড়বে।
কাচারাস্তা এখন খুব কম চোখে পড়ে। উত্তর দক্ষিণের সবচেয়ে বড় রাস্তা দেলোয়ার খা সড়ক এখন ১৮ ফিটের, পূর্ব পশ্চিমের সবচেয়ে বড় রাস্তা এখনো ১২ ফিটের। যেটার উন্নয়ন অতীব জরুরী।
সন্দ্বীপের বড় হাট বাজারের মধ্যে রয়েছে কমপ্লেক্স (সেনের হাট, তালতলীসহ সন্দ্বীপ শহরের জন্য), শিবেরহাট (দক্ষিণের জন্য) ধোপারহাট (মধ্যম দক্ষিণের জন্য) আকবরহাট (উত্তরের জন্য), পৌরসভার বাজার। এছাড়া প্রায় বাড়ির সামনে গড়ে উঠেছে দোকানপাট।
তবে নেই বর্জ্য ব্যবস্থাপনা! রিসাইকেলেবল প্লাস্টিক এক শ্রেণীর মানুষ সংগ্রহ করলেও নন রিসাকেলেবল প্লাস্টিক পরে থাকে যেখানে সেখানে। প্রতিটি বাজারের আশেপাশে রয়েছে বিশাল প্লাস্টিকের স্তুপ। যা পরবর্তীতে জমির উর্বরতা নষ্ট করা, খালে জমে জলাবদ্বতা সৃষ্টি করার মতো অসংখ্য অনাচার সাধন করার কারণ হতে পারে। আগে পুকুরে শুধু গাছের পাতা পরে পানির মান নষ্ট করতো, এখন সেই সাথে যোগ হয়েছে প্লাস্টিক!

জায়গার দাম বেড়েছে কয়েকগুণ। ক্রমাগত নদী ভাঙ্গন দ্বীপের মানুষকে নিঃস্ব করেছে। জীবনে ১৪ – ১৫ বার বাড়ি বদলানোর রেকর্ডও এখানে অনেকের আছে। বাড়ি বদলানো অর্থ ভাড়া বাড়ি নয়, ভিটা বদলেছে। যার কারণে শহরের আশেপাশে বেড়েছে ঘনবসতি।
রয়েছে ছোট বড় সকল কোম্পানির ডিলার। ডিলার ভিত্তিক ব্যবসার কারণে কোম্পানিগুলো ডিলারের কতৃত্বেই ছেড়ে রেখেছে স্থানীয় বাজার। যার কারণে তেমন একটা প্রমোশনাল এক্টিভিটি চোখে পড়েনা।
মজার বিষয় হচ্ছে সন্দ্বীপের প্রায় দোকানপাট মাল্টিপারপাস। ৪০০ স্কয়ারফিটের একটি দোকানে প্লাস্টিকের স্যান্ডেল থেকে নিয়ে বিস্কুট চানাচুর, প্রসাধনী, এমনকি জুয়েলারিও বিক্রি করতে হয়। সুপারশপের কনসেপ্ট মনে হয় এখানকার স্থানীয় দোকানপাট থেকেই পেয়েছে দুনিয়া। বাকি বিক্রি এখানকার অন্যতম শর্ত। তবে একটি ভালো সুপারশপের চাহিদা এখানে আছে।
সৃজনশীল ব্যবসার জনপ্রিয়তা এখনো চোখে পড়ছেনা স্থানীয়ভাবে। খেয়েপরে বাঁচার জন্য যে যেভাবে পারছে ব্যবসা করে যাচ্ছে।
কিছু কিছু বাজারে বিক্রি হয় শুধু সকাল আর সন্ধ্যায়। সেই সময় বাজারের রেস্তোরাগুলোতে ভীর চোখে পড়ার মতো। আমরা যেগুলোকে বাংলা হোটেল বলি।
দ্রব্যমূল্যের উর্ধগতি এখানেও সারাদেশের মতো। বরঞ্চ কিছুকিছু ক্ষেত্রে আরও বেশি। একটা সময় যখন মানুষ চাষাবাদ করতো, নিজের ঘর, নিজের জমির ধান, নিজের ক্ষেতের সবজী, নিজের পুকুরের মাছ খেতো তখন খরচ একটু কম হলেও এখন পুরো খরচ ঢাকার সমান। ঘরভাড়া একটু সাশ্রয়ী এই যা।
স্বল্প আয়ের মানুষজন অন্য সব অঞ্চলের মতোই এখানে সংসার চালাতে হিমসিম খায়। তবে এটাও বলে রাখা জরুরী অন্যান্য অঞ্চলের চাইতে এখানে শ্রমিকের খরচ বেশি।
বর্তমানে সন্দ্বীপ রপ্তানিমূখি কোন উৎপাদনে অবদান রাখতে পারছেনা। গত বিশ বছরের তুলনায় এখানে উৎপাদনশীলতা কমার পাশাপাশি সন্দ্বীপ শুধুমাত্র একটি অবহেলিত দ্বীপ হিসেবে রয়ে গেছে। একটু বিস্তারিত বললে এভাবে বলা যায় :
- আগে শীতকালে খেজুরগাছ থেকে রস সংগ্রহ করা হতো। পুরো সন্দ্বীপ জুড়ে দেখা যেতো এই চিত্র। এখন খেজুর গাছ পাওয়াই দুষ্কর হয়ে গেছে।
- কমেছে কৃষি কাজ। মূল ভূখণ্ডের সাথে পাল্লা এখানে সবজি চাষ হচ্ছেনা। কৃষি বিশেষজ্ঞরা বলছেন ভৌগলিক কারণে উত্তরবঙ্গের অনেক পরে এখানে শীতকাল শুরু হয় বলে কৃষক ফসলের ন্যায্য মূল্য পায়না। কেউ কেউ আবার মানসম্মানের ভয়ে ছেলে মেয়ের চাপেও নাকি কৃষি কাজ ছেড়েছেন! নদী ভাঙ্গনের কবলে অনেক চাষের জমি পড়লেও এখনো অবশিষ্ট খালি জমিতে চাষাবাদ করার মত পর্যাপ্ত জায়গা রয়েছে।
- সন্দ্বীপের যুবকদের বড় একটি অংশ প্রবাসী। যুবকদের মধ্যে এমন কাউকে পাওয়া মুশকিল হবে যে কখনো বিদেশে যাওয়ার চেষ্টা করেনি বা যায়নি। (পারিবারিকসূত্রে ব্যবসায়ী, বা চাকরীতে আগ্রহ আছে এমন কিছু মানুষ ছাড়া)। প্রতিবছর কেউ না কেউ বিদেশে পাড়ি জমায়। দুঃখের বিষয় হচ্ছে আমরা শ্রমিক রপ্তানি করি। একটু সচেতনতা, একটু প্রশিক্ষণ, একটু সঠিক গাইডলাইনের আওতায় আনতে পারলে আমরা শুধুই শ্রমিক পাঠানোর বদলে অভিজ্ঞ কর্মী পাঠাতে পারি।

আমার ধারণা উৎপাদনশীলতাই পারে আমাদেরকে এগিয়ে নিতে। পণ্য থাকলে যাতায়াত ব্যবস্থার উন্নয়ন দরকার হবে। উন্নয়ন হলে পণ্যের সাথে সাথে নাগরিকদের যাতায়াতও আরও দূর্ভোগমুক্ত হবে।
বিদ্যুৎ সাপ্লাই ন্যাশনাল গ্রিডে সংযুক্ত হবার পরে স্থানীয়দের ধারণা সন্দ্বীপ অনেক ডেভেলপ হয়ে গেছে! বিষয়টা অনেকটা এমন যে ঘরে ঘরে শক্তিশালী বৈদ্যুতিক বাতি জ্বলাটাই ডেভেলপমেন্ট। সুউচ্চ দালান তেমন বাড়েনি। যে যার সামর্থ্যের মধ্যে পাকা বাড়ি, পাকা দোকানপাট করছে। তবে সেগুলো দেখেই বুঝা যায় জাস্ট রাজমিস্ত্রী ডেকে বিল্ডিং বানিয়ে ফেলা হয়েছে।
ধুলোবালির কোন অভাব সন্দ্বীপে নেই। শীতকালে সন্দ্বীপে কালো জুতা পায়ে দিয়ে হাঁটা মুশকিল। অনেক দোকানদার সামর্থ্য থাকলেও দোকানে গ্লাস লাগাচ্ছেনা শুধুমাত্র এই ভেবে যে গ্লাস দেখলে কাস্টমার ঢুকবেনা!
২০১১ সালের আদমশুমারি অনুযায়ী সন্দ্বীপ উপজেলার সাক্ষরতার হার ৫১.৫০%। এ উপজেলায় ৪টি কলেজ (সহপাঠ), ১টি মহিলা কলেজ, ৩টি ফাজিল মাদ্রাসা, ৯টি দাখিল মাদ্রাসা, ২৮টি মাধ্যমিক বিদ্যালয়, ৩টি বালিকা উচ্চ বিদ্যালয়, ১টি জুনিয়র উচ্চ বিদ্যালয়, ১৪৯টি প্রাথমিক বিদ্যালয়, ৩১টি আনন্দ স্কুল ও ১৯টি কিন্ডারগার্টেন রয়েছে।
এছাড়াও রয়েছে অগণিত কওমি মাদ্রাসা। কিতাব বিভাগ, হেফজ বিভাগ, নূরানী বিভাগ সহ সম্মিলিত বড় মাদ্রাসার পাশাপাশি অসংখ্য ছোট মাদ্রাসা রয়েছে। প্রায় বাড়ির সামনে ব্যক্তি বা সামাজিক উদ্যোগে গড়ে উঠছে এসকল মাদ্রাসা।
বিগতদিনে বিভিন্ন স্কুল কলেজের পক্ষ থেকে সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠানের আয়োজন করা হলেও এখন আর আগের মতো এসব চোখে পড়েনা। পাবলিক প্রোগ্রাম বলতে বিভিন্ন মাদ্রাসা মসজিদ কতৃক ওয়াজ মাহফিল ও ইসলামি সংগঠন কতৃক কেরাত প্রতিযোগিতার আয়োজন চোখে পড়ে। তাও প্রোগ্রামের পরিমাণ বাড়ার কারণে জনসমাগম কমে গেছে বলে জানা যায়।


মোটামুটি পুরো সন্দ্বীপের মানুষের মধ্যে ধর্মীয় চেতনাবোধ লক্ষনীয়। বিশেষ করে নারীদের মধ্যে। প্রাপ্তবয়স্ক কোন মুসলিম নারীকে বোরখা ছাড়া বাহিরে দেখা যায়না। পুকুরঘাটও পর্দানশীন। ঝড়ে পড়া সুপারিপাতার কাছে এই দ্বীপ অনেক কৃতজ্ঞ। কারণ সুপারি পাতা বাড়ির সামনে পর্দা হিসেবে ব্যবহার হয়। একটা সময় যখন প্রশ্রাব পায়খানার জায়গা আলাদা ছিল তখন এই সুপারিপাতা অনেকের প্রশ্রাবখানার দেয়াল হিসেবে ব্যবহার হতো।

আগে সাদাকালো টিভিতে বৃহস্পতিবারে আলিফ লায়লা, শুক্রবারে পূর্ন্যদৈর্ঘ বাংলা ছায়াছবি ও ঈদের তিনদিনের অনুষ্ঠান দেখা হতো। তখন আয়োজনটাও ছিল ভারী। রিকশায় চড়িয়ে বারো ভোল্টের ব্যাটারি ঘণ্টা হিসেবে চার করে আনতে হতো। ব্যাটারির চার্জ বাঁচানোর জন্য বিজ্ঞাপনের সময় বন্ধ থাকতো টেলিভিশন। এখন টিভির রং বদলেছে। একই সাথে কমেছে ব্যাটারি চার্জ করার কষ্ট। এছাড়াও মুঠোফোনের স্ক্রিন দখল করেছে বিনোদনের পর্দা। তবে মেমোরি লোডের দোকান এখনো চোখে পড়ে।
গত বিশ বছরে গানের রুচির খুব বেশি তারতম্য হয়নি। ঘরে গান শুনলে অল্প আওয়াজে আর না হয় হেডফোন। প্রোগ্রামে সাউন্ডবক্সে গান বাজে। হারিয়ে গেছে দ্বীপের একমাত্র সিনেমা হল। ব্যবসা বন্ধ করে ভবন রেখে দিলে তাও একটা আলোচনার জায়গা থাকতো। ভবনসহ গায়েব। এর কারণ খুঁজতে সিনেমা হল মালিক পক্ষের কারো সাথে কথা হয়নি। তবে স্থানীয় একজন জানিয়েছে পারিবারিক সমস্যার কারণে সব ঘটেছে।
খাবার দাবারে সন্দ্বীপের মানুষ এখনো আগের মতোই বিলাসী। একের অধিক তরকারি, রকমারি পিঠাপুলির পাশাপাশি প্যাকেটজাত খাবারও সমানতালে খেয়ে যাচ্ছে এখনো। বিয়ে শাদীতে যে যার সাধ্যমতো খাতিরদারির সর্বোচ্চ চেষ্টা করে যাচ্ছে। পেটভরে খেয়ে বদনামি করার জন্য বদনামি করার মতো ছোটলোকও এখানে প্রচুর আছে!
সাংস্কৃতিক চর্চার অভাব, নতুনত্বের অভাব। ছোট্ট একটি দ্বীপে এতো মানুষ, প্রতিদিন একই জিনিস একই মানুষ দেখতে থাকার কারণ এখানকার মানসিক বিকাশ হবার পথে বড় বাঁধা। এখানে প্রয়োজন প্রচুর সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠান, সৃজনশীল প্রতিযোগিতা। কবিতার আসর, গল্পের আসর, মুক্তমঞ্চ।
সন্দ্বীপের বিভিন্ন এলাকায় রয়েছে প্রচুর ক্রীড়া ক্লাব। বর্ষায় ফুটবল, শীতে ক্রিকেটের আয়োজন হয় অনেক। তবে দুঃখজনক বিষয় হচ্ছে লং পিচ ক্রিকেট হারিয়ে যাচ্ছে। হিড়িক পড়েছে শর্ট পিচ নামক এক অদ্ভুত ক্রিকেটের! পর্যাপ্ত খেলার মাঠ না থাকা, ক্রীড়া ব্যবসায়ীদের চোখে শর্ট পিচ লাভজনক দেখা এর পেছনে দায়ী। টেনিস বলে টেপ পেঁচিয়ে ক্রিকেট খেলা এখনো চলমান।
এছাড়া তেমন কোন সামাজিক সংস্থার সক্রিয়তা তেমন দেখা যায়না। ‘সন্দ্বীপ’ নামের অসংখ্য সামাজিক সংগঠন রয়েছে শহর কেন্দ্রিক। ইফতার বিতরণ, দূর্যোগ পরবর্তী খাদ্য সামগ্রী বিতরণ ছাড়া এসব সংস্থার তেমন কার্যক্রম চোখে পড়েনা।
অথচ এখানে কাজ করার মতো প্রচুর জায়গা রয়েছে।
১। পরিবেশ বিনষ্টকারী প্লাস্টিকের ব্যবহার কমানোর সচেতনায় কাজ হতে পারে
২। বাল্যবিবাহ রোধে সচেতনার কাজ হতে পারে
৩। দক্ষ নাগরিক, জনসংখ্যাকে জনশক্তিতে রূপান্তরের চেষ্টায় কাজ হতে পারে
৪। শিক্ষিত তরুণদের উদ্যোগে রপ্তানিমুখী উৎপাদনের প্রয়োজনীয়তা অনুভব করে স্থানীয় কৃষকদের সমন্বয়ে প্রোডাক্টিভ সন্দ্বীপ নির্মানের চেষ্টায় কাজ হতে পারে।
৫। ক্ষুদ্র ও কুটির শিল্পের প্রয়োজনীয়তা উপলব্দি করে বাড়িতে থাকা নারীদের প্রশিক্ষণের মাধ্যমে সৃজনশীল পণ্য উৎপাদনের চেষ্টায় কাজ হতে পারে।
৬। উর্বর জমিতে মূল্যবান গাছের চারা রোপণ করে এই উর্বর জমি থেকে সবচেয়ে ভালো আউটপুট বের করার চেষ্টায় কাজ হতে পারে।
এমন অসংখ্য জায়গা রয়েছে কাজ করার মতো। সবাই মিলে ভাবলে আরও বের হবে।
দ্বীপ, সন্দ্বীপ নামের অসংখ্য নিউজ (ব্যাসিক্যালি ফেসবুক একাউন্ট/পেজ/গ্রুপ) সোর্স থাকলেও সময়মত সংবাদ পাওয়া যায়না। এছাড়াও দ্বীপে প্রেস ক্লাব রয়েছে। বিভিন্ন মিডিয়ার প্রতিনিধি রয়েছে। কিন্তু এরমধ্য থাকে বস্তুনিষ্ঠ সংবাদ খুঁজে পাওয়া আরেক যুদ্ধ। স্থানীয়দের মতে স্থানীয় রাজনীতির গ্রুপিং এর মতো সাংবাদিকতাও এখানে গ্রুপিং এ হয়। যার কারণে যে যেদিকটায় সুবিধা পায় তার কলম সেদিকে ঝুঁকে থাকে। আরও হতাশাজনক বিষয় হচ্ছে প্রেস ক্লাবের নেতৃবৃন্দও ফেসবুক স্ট্যাটাসে ‘ই’ আর ‘য়’র ব্যবহার গুলিয়ে ফেলে। আমি যায়, তারা খাই টাইপের অবস্থা!
নিজেরা নিজেরা খুব আন্তরিক এখানে। না হয় দোকানে বাকি কেমনে? এছাড়াও ইউরোপ আমেরিকার মতো ঘরের ভিটা নিয়ে ঠেলাঠেলি, প্রতিবেশীর স্যাক্রিফাইস করতে না পারা, উপকার করলে উল্টা ক্ষতি করে দেয়া, জমির আইল কেটে চিকন করে দেয়া, মুরগীর হাগু নিয়ে আনলিমিটেড ঝগড়া, সামনাসামনি ভালো ভালো দেখিয়ে পেছনে মেরে দেয়া, অল্পতে গরম হয়ে চিল্লিয়ে গলা ফাটানোর মত নানান উন্নত কর্মও সাধিত হয়।
মানুষজনের আন্তরিকতা এখনো সেই পুরনো দিনের মতোই রয়েছে। যার উপর টিকে আছে ৬০০ বর্গামাইল থেকে ছোট হতে হতে ৮০ বর্গমাইলে নেমে আসা ৩ হাজার বছরের পুরনো এই দ্বীপ।
সম্ভাবনা
এখানকার মাটি উর্বর। নিজস্ব জমিতে গাছ লাগিয়ে লং টার্মে ভালো লাভের আশা করা যায়। কম খরচে জায়গা লীজ পাওয়া যায় বলে বায়োফ্লক লাভজনক হতে পারে। হাঁস ও কবুতরের খামার খুব বেশি নেই বলে উৎপাদনমুখী খামার ভালো ফলাফল দিতে পারে।
কৃষি গবেষণা অধিদপ্তরের সহযোগিতা নিয়ে মাটির পরীক্ষা করে বিভিন্ন মৌসুমি ফসল ফলানো সম্ভব। সূর্যমূখি ফুল, সরিষা, তরমুজসহ নানান জাতের সবজী।
* যেহেতু প্রচুর মোটর সাইকেল সেহেতু বাইকের যন্ত্রাংশ, হেলমেট শপ দেয়া যেতে পারে।
* ছাত্রছাত্রী ও সৃজনশীল নাগরিকদের মাথায় রেখে বড় বুকশপ + ক্যাফে দেয়া যেতে পারে।
* ইন্টারনেট ও বিদ্যুতের সহজলভ্যতাকে কাজে লাগিয়ে প্রথমে ট্রেনিং এর ব্যবস্থা পরে তাদেরকে দিয়ে দেশ বিদেশের আইসিটি কার্যক্রম আউটসোর্সিং করা যেতে পারে।
* বিভিন্ন ব্র্যান্ড শপের ফ্র্যান্সাইজি আনা যেতে পারে ছোট পরিসরে।
* মানসম্মত মর্ডান বেকারির চাহিদা রয়েছে।
* পর্যটন সম্ভাবনাও রয়েছে কিছুটা। তবে সেটার জন্য মেগাপ্রজেক্ট জরুরী।
* গার্মেন্টস আইটেম, জুয়েলারি, ডিলারশিপ
* স্থানীয় কুটিরশিল্প (নারী উন্নয়ন)
* পরিবেশ বান্ধব কার্যক্রম (ফান্ড সাপেক্ষে)
* ট্র্যাভেল এজেন্সি, ভিসা প্রসেসিং, হজ উমরা এজেন্ট
প্রতিকূলতা
* প্রাকৃতিক দূর্যোগ
* যাতায়াত ও মালামাল পরিবহণের খরচ বৃদ্ধি
* স্থানীয় অপরাজনিতি / ক্ষমতার পালাবদল / গ্রুপিং পলিটিক্সের বদনজর
* সর্বপরি মানুষের মানসিকতা নিন্মমুখী! যা একটা এলাকার অগ্রযাত্রার পথে বাঁধা।
* ব্যবসায় বাকি দেয়া নেয়ার প্রবণতা
* দক্ষ কর্মী না পাওয়ার আশংকা
(উপরের এই উপলব্দি আমার ব্যক্তিগত। কিছু তথ্যের জন্য ইন্টারনেটের সহযোগিতা নেয়া হয়েছে। ভুল ত্রুটি হলে ক্ষমা করবেন। আর আপনার কাছে কোন আপডেট ইনফরমেশন থাকলে আমাকে জানাবেন। আর কোন কিছুতে আমার সহযোগিতা আপনার কাজে আসবে বলে মনে হলে স্বাগতম)

Leave a Reply